সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৯)

সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৯)
...
নিজের দোষ স্বীকার করেছে মাহিন। নির্দিষ্ট কিছু কারণে শরীফকে খুন করেছে সে।
অপরদিকে সজীবের বন্ধু সুমন আত্মহত্যা করে ফাঁসি দিয়ে। তার চিঠি সাক্ষ্য দেয় যে, সাদমান এবং শরীফ অরুণিমাকে খুন করেছে৷ তবে ধর্ষণকারী তো চারজন! তাহলে বাকি দুইজন কারা? তারা কোথায় আছে এখন? অরুণিমা খুনের সাথে জড়িত কিংবা অরুণিমার পরিচিত প্রায় অনেকেই প্রতিরাতে স্বপ্নে দেখে অরুণিমাকে। তাহলে কি বাকি দুইজন ধর্ষকও স্বপ্নে দেখে তাকে? হয়তো হ্যাঁ, নয়তো না।
বারান্দার রেলিংয়ে একহাত রেখে অন্য হাতে কফির মগ নিয়ে একাধারে কথাগুলো ভেবে যাচ্ছে গোয়েন্দা নিল। তবে সবকিছুর উত্তর ঘন কুয়াশায় দশ ফিট দূরত্বের মতো, কাছাকাছি তবে দেখতে পাচ্ছে না কিছু।
ওসি আতিক সাহেব সন্ধ্যার দিকে সুমনদের বাসার দিকে যান, কী এমন হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।
" শুনেছি আপনার ছেলে বেশ কিছুদিন ঢাকায় ছিল, আজকেই নাকি বাড়িতে ফিরেছিল সে? "
ওসি আতিকের সুমনের মা'কে প্রশ্নটি করেন।
সুমনের মা জবাব দেয়, " হ্যাঁ, সুমন ঢাকায় তার খালার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। "
" আচ্ছা, অরুণিমাকে চেনেন? "
ওসির প্রশ্নে সুমনের মা উত্তর দেয়, " হ্যাঁ, কাদের ভাইয়ের মেয়ে। "
" আপনার ছেলে সুমন অরুণিমার খুনিদের দেখেছিল, সেটা কি আপনি জানতেন? "
ওসির প্রশ্নের জবাবের বদলে এবার চুপ থাকে সুমনের মা। চুপ থাকতে দেখে ওসি আতিক আবারও বলে, " দেখুন, যদি আপনি সবকিছু বলেন তাহলে অরুণিমার ধর্ষনকারী'রা তাদের পাপের প্রাপ্য শাস্তি পাবে। "
সুমনের মা মুখ খুলে। তিনি বলেন, " সুমন সাদ আর শরীফকে দেখেছিল, দুইজন তো মরে গেছে! "
" ধর্ষণ করেছে চারজন, মারা গিয়েছে দুইজন। আরো বাকি আছে দুজন ধর্ষক। "
সুমনের মা সোজা বাক্যে বলে, " সুমন বাকিদের কারোর সম্পর্কে বলেনি আমাকে। "
ওসি আতিক প্রশ্ন করেন, " আচ্ছা! সুমন ওইদিন এতরাতে বাহিরে গিয়েছিল কেন? "
" সুমন বেশি রাতে বাহিরে যায়নি, গিয়েছিল ফজরের আজানের অল্প কিছুক্ষণ আগে৷ আমি টের পেয়েছিলাম। "
" আচ্ছা! আর কিছু জানেন? "
সুমনের মা বলে, " সুমনকে ওই রাতে দেখে ফেলেছিল সাদ। সুমনকে হুমকি দেয়, কাউকে বললে খুন করে ফেলবে৷ কথাগুলো সুমন আমাকে বললে আমিই সুমনকে তার খালার বাসায় পাঠিয়ে দিই৷ "
" ওহ আচ্ছা! কিন্তু শেষ রাতে সাদমান আর শরীফ অরুণিমার লাশ নিয়ে টানাটানি করছিল কেন সেটা মাথায় ঢুকছে না আমার৷ যাইহোক, আমি আসি এখন। "
বলে ওসি আতিক বাসা থেকে বের হতে যাবে তখন সুমনের মা বলে, " থামুন। "
ওসি আতিক ঘুরে দাঁড়ায় সুমনের মায়ের দিকে৷ সুমনের মা তখন বলে, " ওই রাতে সুমনের সাথে অনেক কথা হয়েছিল সাদ আর শরীফের। "
ওসি আতিক জবাব দেন, " কী কথা হয়েছিল জানেন কিছু?"
" সাদ সুমনকে দেখে বলেছিল, কাজ তো শেষ মাঝরাতেই। নেশায় আসক্ত ছিলাম তখন, হুঁশ ফিরতেই আমি আর শরীফ লাশটাকে ঝোঁপে ফেলতে আসলাম। আর তুই দেখে ফেললি? "
সুমনের মা কথাগুলো বলে একটু থামে৷ তারপর আবার বলে, " এই কথাগুলো বলেই তারপর সুমনকে হুমকি দিয়েছিল। সুমন সবকিছু খুলে বলেছিল আমাকে। "
ওসি আতিক জবাব দেন, " আর কিছু জানেন? "
সুমনের মা মাথা নেড়ে জানান দেয়, " না। "
ওসি আতিক আর কিছু না বলে মুচকি হাসি দিয়ে "ধন্যবাদ" জানিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন৷
হালকা অন্ধকার গাঢ়'তে রূপ ধীরেধীরে। সজীব বসে আছে ছাদের ওই বেঞ্চিটায়। অরুর ভাবনার সাথে নিজের বিচ্ছেদ ঘটাতে পারছে না কিছুতে৷ সজীব ভাবতে শুরু করে, বহুদিন কবিতা শোনানো হয় না আরুকে। রাতে আরুর দেখা মিললেও দিনে তো দেখতে পাই না তাকে! মনেমনে ছন্দ মেলাতে থাকে সজীব।
" দিনের আলোয় থাকো কোথায়
নিশি'তে কেন আসো?
এমন করে কী পাও তুমি
কোন সুখেতে ভাসো! "
ছন্দ মেলানো'তে ছেদ ঘটায় বৃষ্টির "ঝরঝর" আওয়াজ। সজীবের গায়ে মিশে যায় বৃষ্টির ফোঁটা। সজীব দাঁড়িয়ে পরে৷ তারপর বলতে শুরু করে,
" বৃষ্টি নামছে সন্ধ্যা হচ্ছে
কান্না করছে কে?
ভিজছি আমি তুমি হীনা
ভালোবাসি যে! "
আর কিছু বের হয় না সজীবের মুখ থেকে৷ এদিক-ওদিক তাকায় কিছুক্ষণ, অনুভূতিতে খুঁজে নেয় অরুণিমাকে। অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায় শরীরে, মনেমনে প্রশান্তি মিলে তার।
" ধপ! "
ছোট একটি আওয়াজ কানে আসতেই চোখ খুলে গোয়েন্দা নিল। বারান্দা থেকে আওয়াজটা এসেছে। ওঠে বসে নিল। বাহিরে দমকা বাতাস বইছে, জানালা একটা তাঁক খোলা ছিল বিধায় নজরে আসে নিলের। হঠাৎ "ঝন" আওয়াজে ঘুমে ভর্তি মাথাটা ঝাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নিল। ধীরেধীরে দরজা খুলে বাহিরে আসতেই একটা ছায়া যেতে দেখে সিঁড়িঘরের দিকে। নিল ধীরপায়ে আগাতে শুরু করে। নিল সিঁড়ির কাছে গিয়ে চমকে উঠে। সিঁড়ির উপর নিলের ঠিক উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেউ৷ নিল লক্ষ্য করে, সবুজ শাড়ি পরা একজন মেয়ে। এমনাবস্থায় নিলের মনে এসে যায় অরুণিমার কথা৷ নিলের গলা কাঁপছে৷ তবুও কাঁপা গলায় বলে, " কে তুমি? "
চিকন গলায় আওয়াজ আসে, " আটকে রেখেছেন কেন? ছেড়ে দিন তাকে৷ এটা আমার শিকার, সমস্যা হচ্ছে আমার৷ ছেড়ে দিন তাকে৷ "
নিল তেমন বুঝতে পারছে না মেয়েটির কথার মানে। আবারও প্রশ্ন করে, " কে তুমি? "
" এতটা বোকা আপনাকে ভাবিনি। "
নিল কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, প্রতিবার নিলের প্রশ্নের উত্তর ঘুরিয়ে দিচ্ছে মেয়েটি। পেছনে কিছু একটা পড়ার "ধপাস" আওয়াজে পিঁছুফিরে গোয়েন্দা নিল। লক্ষ্য করে বারান্দায় ঝুলানো ফুলের টবটি ফ্লোরে পড়ে গিয়েছে৷ আবার ফিরে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় নিল, মেয়েটি আর নেই! কে ছিল মেয়েটা? প্রশ্নটি নিলের মাথায় আঘাত করছে প্রায়। শোয়া থেকে ওঠে বসে পড়ে নিল। যাহ, স্বপ্ন ছিল এটা! লাইট জ্বালিয়ে দেয়ালে আটকানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিল দেখে, এখন রাত দুইটা বেজে ষোল মিনিট৷ টিপটিপ পায়ে রুম থেকে বের হয় নিল, বারান্দায় ফ্লোরে নজর যেতেই অবাক হয় সে। ফ্লোরে ফুলের টবটি ভেঙে পড়ে আছে, অথচ বাহিরে বাতাসের কোনো ছিটেফোঁটাও নেই!
মেয়েটা কি অরুণিমা ছিল? আর কাকে কাকে ছেড়ে দিতে বলেছিল! মাহিনকে? নিল আর কিছু ভাবতে পারছে না৷ আগামীকাল যা হওয়ার হবে, বিছানার দিকে পা বাড়ায় নিল।
" ভালোবাসতে আসে বাধা
করতে হয় দ্বন্দ্ব,
নিশি'তে আসি আমি
কারণ দিনে অন্ধ। "
অরু সজীবকে কবিতা শোনায়৷ সজীব হাতদুটো চেপে ধরে তাকিয়ে আছে অরুর দিকে। মুখ ফোটে কিছু বলতে পারছে না সে, বোধ হচ্ছে হারিয়ে গিয়েছে অন্যজনায়৷ অরু আবারও বলতে শুরু করে,
" বৃষ্টি নামুক সন্ধ্যা পেরুক
আসবো আমি ফিরে
এই আমি'র অস্তিত্ব কেবল
শুধু তোমায় ঘিরে। "
সজীব চোখ থেকে নজর নামিয়ে ঠোঁটের দিকে তাকায়। কথা বলাতে সৌন্দর্যের হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছে অরুর মুখে।
সজীব অরুকে জিজ্ঞেস করে, " সত্যিই কি আমরা একসাথে আছি এখন? "
অরু কাব্যিক সুরে জবাব দেয়,
" বাধা দিলে তাও আসি,
কারণ তোমায় ভালোবাসি। "
অরুর কথায় সজীব হাসে। চেনা সেই ঘ্রাণ সজীবকে অরুর দিকে টানে। তখন নিজেকে উন্মাদ মনে হয় তার। মনে হচ্ছে সেই ঘ্রাণ নাকে এসে এতটাই ভীড় করেছে যে, অক্সিজেনেরা ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না কিছুতে। একপ্রকার দম বন্ধ হয়ে আসে সজীবের। লাফিয়ে উঠে শোয়া থেকে। চারিদিকে ফজরের আজান হচ্ছে। সজীব এখনো কোনো ব্যাখ্যা পায়নি ফজরের সময়ে ধড়ফড়িয়ে ওঠার কারণের৷
সকাল।
" ঠকঠক " আওয়াজে চোখ খুলে গোয়েন্দা নিল৷ বাহির থেকে শুভ'র কণ্ঠে ভেসে আসে, " স্যার, দরজা খুলুন। "
নিল ঘুমঘুম চোখে শোয়া থেকে ওঠে তারপর দরজা খুলে। শুভ'কে জিজ্ঞেস করে, " কী হয়েছে এত সকালে? "
" আপনার ফোন অফ কেন? "
নিল এক বাক্যে জবাব দেয়, " চার্জ নেই হয়তো। "
" আপনার ফোন বন্ধ পেয়ে আতিক স্যার আমাকে কল দিয়েছিলেন। অরুণিমা খুন হওয়া জায়গায় আরেকটা খুন হয়েছে! "
নিলের চোখে থাকা সমস্ত ঘুমা উধাও হয়ে যায় মূহুর্তের মধ্যে। অবাক হয়ে বলে, " হোয়াট? আমি কি ঠিক শুনছি? "
শুভ জবাব দেয়, " সবকিছুই ঠিকঠাক শুনেছেন। "
নিল বলে, " অপেক্ষা করো একটু। তৈরি হয়ে আসছি। "
বলে চলে যায় ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে।
নিল আর শুভ জীপে করে গ্রামে প্রবেশ করতেই লক্ষ্য করে রাস্তায় অনেক মানুষের আনাগোনা। পুলিশ অনেকক্ষণ আগে চলে এসেছে খুন হওয়া জায়গায়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে খুন হওয়া ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেয়া হবে পোষ্টমর্টেমের জন্য। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে নিল খুন হওয়া দেহটা দেখে চমকে উঠে একদম। এত বাজেভাবে কেউ কাউকে খুন করতে পারে? সারা শরীরের প্রায় অর্ধেক চামড়া খাবলে তুলে নেওয়া হয়েছে। নাকটা চেপ্টে দেয়া হয়েছে কিছুর আঘাতে। মুখটা "হা" হয়ে আছে, কারণ দাঁত বলতে কিছুই নেই মুখে। সব দাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে। সাদমান খুনের ন্যায় এই ব্যক্তিরও ডান চোখে বিঁধে দেয়া হয়েছে একট কাঁচা সরু ডাল, যেটা চোখ দিয়ে গিয়ে মাথায় প্রবেশ করেছে। নিলের সহ্য হয় না এতকিছু। ওসি আতিকের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে। ওসির নজরে আসতেই নিল প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, " লোকটার নাম কী? আর কে সে? "
" হামিদ৷ এই এলাকারই। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি ছেলেটা মাহিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ "
নিল ওসির দিকে তাকায়। মুচকি হেসে বলে, " হামিদের ডান চোখে বিঁধে দেয়া সরু ডালে আবারও অরুণিমার হাতের ছাপ পাবেন৷ আচ্ছা! এটার হাতেও কি দড়ি দিয়ে বাঁধার দাগ আছে? "
ওসি আতিক জবাব দেয়, " হ্যাঁ, আছে। "
নিল আবারও বলে, " আপনাদের হেফাজতে থাকা দড়িটার সাথে একদম মিলে যাবে। নিশ্চিন্তে থাকুন। "
নিলের কথার ব্যাখ্যা স্পষ্ট বুঝতে না পেরে ওসি আতিক বলে, " বুঝিয়ে বলবে সবকিছু? "
" পরে সব বুঝতে পারবেন৷ হামিদের বন্ধু মাহিনের বাসায় যাচ্ছি, দেখতে হবে ভালোভাবে। "
কথাটি বলে শুভ'কে সাথে নিয়ে মাহিনের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় নিল।
গাড়ি চলাকালীন সময় শুভ নিল'কে জিজ্ঞেস করে, " স্যার, অরুণিমার দুইজন ধর্ষক শনাক্ত করতে পেরেছিলাম আমরা৷ এখন আরেকটা খুন হলো৷ যদি এটাও ধর্ষকদের একজন হয় থাকে, তাহলে চতুর্থ ধর্ষকটা কে আর কোথায়? "
নিল বলে, " সন্দেহ সঠিক হলে সেটা মাহিন। তার আগেই সব রহস্যের উদঘাটন করতে হবে আমাদের৷ মাহিনের কিছু হলে এই রহস্যের সমাধান করা বোধহয় আমাদের দ্বারা সম্ভব হবে না। "
শুভ কথা না বাড়িয়ে চুপ থাকে৷ অল্প খানিক সময়ের মধ্যে তারা পৌঁছে যায় মাহিনের বাসায়।
চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান বাসায় নেই। তাই বাসার মিসেসের থেকে অনুমতি নিয়ে মাহিনের রুমে ঢুকে পড়ে নিল এবং শুভ। রুমে ঢুকে দেয়ালে টানানো একটা ছবি দেখে থমকে দাঁড়ায় নিল, এই ছবিটার হুবহু দেখেছিল সাদমানের রুমে!
নিল ভাবে, " শরীফ তো বলেছিল, সবগুলো বন্ধু ঢাকার। তবে মাহিন এখানে কেন? "
এজন্যই প্রথমবার মাহিনকে দেখে চেনা-চেনা লাগছিল নিলের। শুভও বুঝতে পারে ছবির ব্যাপারটি। শুভ নিল'কে প্রশ্ন করে, " শরীফ আর মাহিনের দুজনের কথাতেই বুঝা যায়, মাহিন আর সাদমানের কোনো সম্পর্ক ছিল না৷ তাহলে একই ফ্রেমে দুইজন কী করে? "
" হয়তো এর পেছনেও আছে লুকানো অনেক তথ্য। "
নিলের কথা শুনে শুভ আর কিছু বলে না। সারারুম দেখতে থাকে ভালো করে, আরও কিছু মিলতে পারে এই ভেবে।
( To be continue... )

Post a Comment

Previous Post Next Post