সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৭)

সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৭)
...
" তাহলে কি এই খুনগুলোর পেছনে কাদের মিয়ার হাত? "
বাসার উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে চলছে নিল এবং শুভ। তখন শুভ নিল'কে প্রশ্নটি করে।
" কাদের মিয়া'কে সন্দেহ করা যায়, তবে খুন করেছে এই সম্ভাবনা মাত্র বিশ ভাগ৷ "
নিলের কথা শুনে শুভ বলে, " যুক্তি চাই৷ "
" প্রথমত, কোনো বাবা কখনোই তার মেয়েকে চারজনের মাধ্যমে ধর্ষণ করিয়ে খুন করবে না। "
নিল জবাব দেয়, " দ্বিতীয়ত? "
" খুন হওয়া জায়গায় কাদের মিয়া একা গিয়েছিলেন। সাদমানের মতো প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষকে কাদের মিয়ার একা খুন করা সম্ভব না৷ আর যদি কাদের মিয়া'ই খুন করে থাকতেন, তাহলে খুন হওয়া জায়গায় কাদের মিয়ার সাথে আরও কয়েকজন আসতো। "
শুভ প্রশ্ন করে, " তৃতীয়ত কোনো কারণ আছে? "
" তৃতীয়ত, যদি প্রথম দুইটি খুন হয় তাহলে শরীফের আত্মহত্যাটিওব হতে পারে খুন। আর আর রফিক মিয়ার বাড়িতে গিয়ে কাদের মিয়া খুন করবে কীভাবে!"
শুভ জবাব দেয়, " এমনটাও হতে পারে, রফিক মিয়া কাদের মিয়ার সাথে হাত মিলিয়েছিলো! "
প্রতিত্তোরে নিল বলে, " সাদমান রফিক মিয়ার একমাত্র ছেলে। আর কাদের এবং রফিক মিয়া নিজেরা নিজেদের সন্তানদের খুন করবে কোন উদ্দেশ্যে! "
শুভ নিলের কথায় একমত হয়৷ তারপর বলে, " আচ্ছা, ঠিক আছে। চতুর্থত কোনো কারণ আছে? "
" নাহ, আপাতত আর কিছু বলছি না এখন৷ "
শুভ আর কথা বাড়ায় না। ঘন্টাখানেকের মধ্যে এসে পৌঁছে যায় নিজ গন্তব্যে।
সজীব অরুণিমার চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিয়ে তারপর বলে, " প্রতিরাতে এই চুলের ঘ্রাণে আমি পাগল হই কেন? "
অরু একগাল হেসে দেয়, এতে গালটা সামান্য ফুলে উঠে। অরু বলে, " কারণ, আপনি আমাকে ভালোবাসেন। "
সজীব প্রশ্ন করে, " আচ্ছা, ডায়রি লিখতে যে! সেগুলো আমাকে নিয়ে? "
অরু জবাব দেয়, " সব কথা প্রকাশ করতে নেই। "
সজীব আর কিছু বলে না৷ অনুভব করে তাকে অরুর দিকে টানছে। ঘনঘন শ্বাসের আদান-প্রদান হচ্ছে, দুজন'ই নীরব। নীরবতা ভেঙে অরু বলে, " চলুন, চাঁদ দেখে আসি৷ আজকের চাঁদটা খুব সুন্দর। "
" আচ্ছা চলো৷ "
কথাটি বলে দুজন দুজনার হাত ধরে হাঁটতে থাকে ছাদের উদ্দেশ্যে।
মাসের মধ্যাংশের চাঁদ৷ চাঁদ যেন আস্ত এক সাদা রঙের থালা। চাঁদ মামারও এক অদ্ভুত নিয়ম৷ মাসের শুরুতে বেশ রোগা-পাতলা থাকে চাঁদ মামা৷ নতুন মাস পেয়েছে এই খুশিতে তরতাজা হতে থাকে প্রথম পনের দিন৷ মাসের অর্ধাংশে নিজের সাস্থে পূর্ণতা পায় চাঁদ। এই মাসটাকে আবার হারিয়ে ফেলবে এই শোকে আবারও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দেয় বেচারা চাঁদ৷ মাস যেতে যেতে শুকিয়ে যায় আবার৷ নতুন মাস পেয়ে আবারও খুশি হয় চাঁদ মামা। এভাবেই কেটে যাচ্ছে মামার হাতে গোনা প্রতিটা মাস, প্রতিটা বছর।
ছাদের কোণে একটি বেঞ্চিতে বসে আছে দু'জন। অরু চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে, চাদের আলো যেন সবটা এসে ভড় করলো অরুর মুখে। সজীব অবাক নয়নে তাকিয়ে আছি অরুণিমার দিকে। অরুণিমা প্রশ্ন করে, " কী দেখছেন? "
সজীব জবাব দেয়, " এত কষ্ট করে বাহিরে আসার কী দরকার ছিল! ভেতরে বসে থাকলেই তো চাঁদের দেখা পেতাম আমি। "
অরুণিমা হেসে বলে, " আচ্ছা তাইনা? "
হঠাৎ আকাশটা মেঘলা হয়ে যায়। অরুণিমা আসমানের অবস্থা দেখে বলে, " চলুন, রুমে চলে যাই।"
সজীব জবাব দেয়, " না, তোমার কোলে শুয়ে কিছুটা সময় কাটুক৷ "
বলে সজীব শুয়ে পড়ে অরুণিমার কোলে৷ অরুণিমা সজীবকে বলে, " প্রতিদিন তো আমাকে কবিতা শোনাতেন, আজ আমি শুনাই? "
সজীব এক শব্দে বলে, " আচ্ছা।"
অরুণিমা বলতে শুরু করে,
" মেঘলা আকাশ হাল্কা বাতাস,
যাচ্ছে সেথায় বয়ে।
বৃষ্টি বেশে নামবো আমি,
শুধু তোমার হয়ে। "
সজীব কবিতা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে। কয়েক ফোটা ঠাণ্ডা পানির ছিটকে পড়াতে সজীবের ঘুম ভাঙে৷ সজীব চোখ খুলে দেখে সদ্য বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ সজীব উঠে বসে পড়ে৷ চারিদিকে ফজরের আজান হচ্ছে। হুট করে ভয়ে সজীবের মাথা চক্কর দিয়ে উঠে৷ ভাবনায় আসে, আরে! আমি তো আরুকে প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখি, তাহলে আমি এখানে কেন!
.
.
নতুন দিনের যাত্রা।
নিল এবং শুভ বসে আছে থানায়। নির্দিষ্ট আসনে বসে আছেন ওসি আতিক। ওসি আতিক শুভ'র মুখে গতরাতে ঘটে যাওয়া কাহিনী শুনে বলেন, " তাহলে কাদের মিয়া ওখানে কেন? "
" কিছু একটা কারণ তো আছেই। আচ্ছা শরীফের পোষ্টমর্টেম রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু বলেন। "
ওসি আতিকে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিল উনাকে জিজ্ঞেস করে৷ আতিক জবাব দেয়, " নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছাদ থেকে লাফিয়ে মৃত্যু। তবে ঘুমের ঔষধ-ও খেয়েছিল সে, ডিসিপ্লিন-২ ঘুমের ঔষধের নাম। "
নিল বলে, " আচ্ছা চলুন, ঘুরে আসি ওইদিক থেকে একবার৷ "
আর কথা না বাড়িয়ে সবাই চলে রফিক সাহেবের বাসার উদ্দেশ্যে৷
সুমন গ্রামে ফিরে এসেছে।
সজীব আর দিপু বসে আছে খাটে, সামনে একটি চেয়ার পেতে সেখানে বসে আছে সুমন। সুমন সজীবকে উদ্দেশ্য করে বলে, " বন্ধু! গত শনিবার রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, তোর আর অরুর বিয়ে হয়েছে। সেখানে আমি আর দিপু সাক্ষী ছিলাম। "
সজীব একপ্রকার রাগী ভাব নিয়ে বলে, " হ্যাঁ, তো কী হয়েছে? "
সুমন কিছু না বলে চুপ থাকে৷ তখন পাশ থেকে দিপু বলে, " তো তুই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল? স্বপ্ন তো আমরাও দেখেছিলাম। "
" কারণ, আমি স্বপ্নে অরুর ধর্ষিত দেহও দেখেছিলাম৷ "
দিপু জবাব দেয়, " স্বপ্নে দেখেছিস, বাস্তবে নয়। পালানোর কারণ কী? "
সুমন কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায় প্রথমে। তারপর বলে, " দোস্ত, আমি পরে বলবো সব৷ এখন বাসায় যাচ্ছি। "
সজীব এবং দিপুর থেকে কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে বসা থেকে উঠে পড়ে সুমন। বাসা থেকে বের হয়ে যায় সে, হাঁটতে শুরু করে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
গোয়েন্দা নিল রফিক মিয়ার থেকে অনুমতি নিয়ে সারা বাসার রুমগুলো ভালোভাবে দেখতে শুরু করে, যদি কিছু একটা সমাধান চোখে পড়ে এই আশায়। বাসার প্রতিটি রুম ভালোভাবে লক্ষ্য করে নিল এবং শুভ৷ তবে কোনো তথ্যই মিলেনি সাদমান এবং শরীফের ব্যাপারে। শুধুমাত্র রফিক মিয়ার রুমটা দেখার বাকি।
নিল এবং শুভ পা বাড়ায় রফিক মিয়ার রুমে উদ্দেশ্যে৷ সারারুমে অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি৷ রফিক মিয়া বয়ষ্ক মানুষ, এইজন্য অনেক ঔষধ খেতে হয় উনাকে৷ পলিথিনে রাখা ঔষধের দিকে নজর যায় নিলের৷ পলিথিন থেকে সবগুলো ঔষধ নামিয়ে একটা প্যাকেটে চোখ আটকে যায় নিলের। ডিসিপ্লিন-২! এটা সেই ঘুমের ঔষধ, যা আত্মহত্যা করা রাতে খেয়েছিল শরীফ৷
ওসি আতিক বাহিরে দাঁড়িয়ে এলাকার চেয়ারম্যান শামসুজ্জামানের সাথে কথা বলছেন। শামসুজ্জামান নাকি এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে ঢাকায় যাচ্ছেন, পুলিশেরা এখানে এসেছে শুনে ওসির সাথে দেখা করতে এসেছেন তিনি। ওসি আতিক প্রশ্ন করেন, " তো পথঘাট ভালোভাবে চেনেন তো? "
শামসুজ্জামান জবাব দেয়, " রাস্তাঘাট চিনি, তবে বন্ধুটা ঢাকায় নতুন ফ্ল্যাট নিয়েছে৷ তাই বাসা চিনতে একটু সমস্যা হতে পারে। তবে বন্ধুর সাথে কথা বলে আমার ছেলে মাহিন তার ঠিকানার বিস্তারিত একটা কাগজে লিখে দিয়েছে৷ "
আতিক সাহেব আবারও প্রশ্ন করেন, " আপনার ছেলে তো কয়েকদিন আগে ঢাকা গিয়েছিল! "
শামসুজ্জামান জবাব দেয়, " হ্যাঁ, তবে গতকাল ফিরে এসেছে। "
ওসি আতিক বলে, " আচ্ছা, আপনার ছেলের দেয়া কাগজটা একটু দেখি তো! "
ওসির মনে সংশয় জাগে, তাই কাগজটি দেখতে চান তিনি। শামসুজ্জামান পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দেয় আতিকের হাতে।
ওসি আতিক কাগজের লেখাগুলো দেখে একদম চমকে উঠে, তবে তা প্রকাশ করে না শামসুজ্জামানের সামনে।
ওসি আতিক বলে, " আপনি যদি অনুমতি দেন, এই কাগজটার একটা ছবি তুলে রাখি? "
চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সম্মতি দেয়৷ সম্মতি পেয়ে আতিক সাহেব নিজের ফোনে একটি ছবি উঠিয়ে নেন। শামসুজ্জামান সাহেব বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
নিলের সামনে এসে ওসি আতিক বলে উঠে, " নিল, দেখো অবাক করা একটা জিনিস। "
নিল বলে, " আমিও অবাক হয়ে বসে আছি রফিক মিয়ার রুমে যাওয়ার পর থেকে। "
" কী এমন দেখে অবাক হয়েছো? বলো শুনি! "
ওসি আতিকের প্রশ্নে নিল জবাব দেয়, " শরীফের পেটে ঘুমের ঔষধ ডিসিপ্লিন-২ পাওয়া গিয়েছিল, আর এই ঔষধ আমি রফিক মিয়ার রুমে দেখতে পেয়েছি৷ "
ওসি আতিক অবাক হয়ে বলে, " কিহ! তাহলে কি এসবে রফিক মিয়ার হাত আছে? "
নিল সোজা জবাব দেয়, " হয়তো হ্যাঁ, নয়তো না৷ "
" তুমি এসব দেখে তো অবাক হয়েছো মাত্র। আর আমি যা দেখেছি তুমি এটা দেখলে হতবাক হয়ে যেতে। "
" আচ্ছা, কী সেটা? এখন দেখি!"
নিলের কথায় ওসি আতিক শরীফের বুকপকেটে থাকা চিঠি আর নিজের ফোনে তোলা কিছুক্ষণ আগের ছবিটা নিল'কে দেখায়৷ তারপর বলে, " ফোনেরটা এলাকার চেয়ারম্যান শামসুজ্জামানের ছেলে মাহিনের হাতের লেখা। "
নিল এবার আসলেই হতবাক হয়ে যায়৷ অবাক চাহনিতে ওসির দিকে তাকিয়ে বলে, " কাগজ এবং ফোনের ছবি দুটোর হাতের লেখায় হুবহু মিল! "
অপরদিকে সারা এলাকা ছড়িয়ে পড়ছে, সুমন গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে৷ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিল এবং ওসির কানেও কথাটি এসে পৌঁছায়৷ তারা আর বাড়তি কথা চিন্তা না করে ছুটে চলে সুমনের বাসার উদ্দেশ্যে।
ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে সুমন৷ বাহিরে অনেক লোক জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশেরা ভেতরে প্রবেশ করেছে ভেতরে, লাশ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানোর জন্য। নিল পুলিশদের সাথে ভেতরে প্রবেশ করে৷ টেবিলের দিকে নজর যেতেই সে লক্ষ্য করে, টেবিলের উপর একটি সুইসাইড নোট৷
কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে গোয়েন্দা নিল। এতে লেখা, " অরুর দেহটা টেনে নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলতে দেখেছিলাম সাদ ভাই আর তার সাথে থাকা শরীফ ভাইকে, ওনারা-ও আমাকে দেখে ফেলেছিল। তাই ওইদিন-ই মরার ভয়ে এলাকা ছেড়ে আমি পালিয়ে যাই৷ কিন্তু একটা রাতও আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। অরু আমার স্বপ্নে এসে প্রতিটা রাতে প্রচুর বিরক্ত করে৷ আমি মুক্তির পথ বেছে নিলাম। "
গোয়েন্দা নিল একদম "থ" মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর মনেমনে ভাবছে, " অবাক কাণ্ড! আসলে আসামী কারা? সাদমান আর শরীফ নাকি রফিক মিয়া অথবা কাদের মিয়া? ব্যাপার কী? আমরা যাচ্ছি এদিকে, তবে আমাদের টানছে ওইদিকে। তাজ্জব ব্যাপার! "
নিল আর ভাবতে পারছে না কিছু৷
( To be continue... )

Post a Comment

Previous Post Next Post