সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৫)

সেও ভালোবাসে (পর্ব-০৫)
...
" অরুণিমা আর সাদমান দু'জনের খুনের মধ্যে কিছু তো সম্পর্ক আছেই। "
কফির মগ হাতে নিয়ে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে নিজে-নিজে ভেবে যাচ্ছে গোয়েন্দা নিল। মেয়েটাকে ধর্ষণ করে তারপর খুন করা হয়। পরদিন সকালে যেখানে মেয়েটার মরদেহ পাওয়া যায়, ঠিক সেখানেই পাঁচদিনের মাথায় পাওয়া গিয়েছে সাদমানের লাশ।
" এই দুটো খুনের মাঝে সম্পর্ক থাকতেই পারে, তবে অরুণিমার খুনের ব্যাপারটা আগে দেখতে হবে। "
ভাবছেন গোয়েন্দা নিল৷ আগে অরুণিমার খুন এবং ধর্ষণকারীদের শনাক্ত করতে পারলে সাদমানের ব্যাপারটা ফয়সালা করতে বেশি সমস্যা হবে না মনে হচ্ছে গোয়েন্দা নিলের৷
শুভ দরজা ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিয়ে বলে, " স্যার, আসতে পারি? "
" আসো৷ "
অনুমতি পেয়ে শুভ ভেতরে প্রবেশ করে৷ তারপর নিল'কে উদ্দেশ্য করে বলে, " তাহলে আজ আমরা কোথায় যাচ্ছি? "
" অরুণিমা খুনের সমাধান আগে করতে হবে আমাদের৷ "
শুভ বুঝতে পারে এখন তাদের লক্ষ্য অরুণিমাদের বাসা৷ তাই কিছু না বলে চুপ থাকে সে৷ গোয়েন্দা নিল আবারও বলে, " বসো একটু, আমি প্রস্তুতি নিয়ে আসছি৷ "
গোয়েন্দা নিল এবং সহকারী শুভ বসে আছে জীপে৷ তার লক্ষ্য অরুণিমাদের বাসা৷ শুভ কোনো সময় নিল'কে প্রশ্ন করা ছাড়া থাকতে পারে না। শুভ নিল'কে জিজ্ঞেস করে, " আচ্ছা স্যার, অরুণিমা মাঝরাতে বাসা থেকে বের হয়েছিল কেন? বাসা থেকে জোর করে বাহিরে এনে ধর্ষণ করা তো এই এলাকায় কখনো সম্ভব না! "
নিল কিছু একটা ভাবতে-ভাবতে জবাব দেয়, " এর পেছনে কিছু একটা কারণ আছে অবশ্য। অরুণিমার কারোর কথায় বাসা থেকে বের হয়েছে অথবা তাকে অন্যভাবে বের করা হয়েছিল৷ "
শুভ আরও কিছু বলতে যাবে তখন নিলের ফোনে ওসি আতিকের কল৷ শুভ চুপ থাকে৷ নিল কল রিসিভ করে বলে, " জ্বী স্যার, বলুন৷ "
" সাদমানের সহকারী শরীফ আত্মহত্যা করেছে৷ রফিক মিয়ার বাসায় আসো তাড়াতাড়ি। "
" আচ্ছা, আসছি৷ "
বলে কল কেটে দেয় গোয়েন্দা নিল।
শরীফ আত্মহত্যা করেছে৷ সাদমানদের বাসার তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সে।
ওসি আতিক সহ আরও কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে রফিক মিয়ার বাসার একপাশে। নিচের একটা পাথরের উপর পড়েছিল শরীফের দেহ৷ নাক-মুখ একদম থেঁতলে গিয়েছে তার। শরীফের মরদেহ থেকে নেশাদ্রব্যের গন্ধ আসছে। ওসি আতিক ধরে নিয়েছেন, শরীফ রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আত্মহত্যা করেছে। গোয়েন্দা নিল এবং শুভ জীপ থেকে নেমে শরীফের পড়ে থাকা দেহটার কাছে আসে। নিল শরীফের দিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে৷ উপুড় হয়ে পড়েছে উপর থেকে, চেহারাটা নিচের থাকা এক পাথর বরাবর পড়েছিল৷ নিল ওসি আতিককে উদ্দেশ্য করে বলে, " তার শার্ট-প্যান্টের পকেটগুলো ভালোভাবে চেক দিন, আমি তার রুম থেকে ঘুরে আসছি৷ "
ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে মরদেহ নেয়ার উদ্দেশ্যে। শুভ নিলের পিঁছুপিঁছু চলে শরীর থাকা রুমের উদ্দেশ্যে।
ফ্রিজে থাকা বীয়ারের বোতলগুলো সারারুমে ছড়িয়ে আছে। বোতলে সংখ্যা দেখেই বুঝা যাচ্ছে, শরীফ প্রচুর পরিমাণে নেশা করেছিল গতরাতে। খাটের বিছানা এলোমেলো, ফ্লোরে আধখাওয়া অনেকগুলো সিগারেটের অংশ। আর তেমন কিছুই রুমে নেই। নিল রুম থেকে বের হয়ে ওসি আতিকের কাছে যায়৷ কাছে যেতেই ওসি আতিক বলেন, " শরীফের বুকপকেটে একটা চিঠি পাওয়া গিয়েছে৷ "
নিল ওসি আতিকের দিকে ভালোভাবে তাকাতে তিনি নিলের হাতে কাগজটা ধরিয়ে দেন। নিল কাগজটা খুলে লেখাগুলোতে চোখ বুলায়, " অরুর হাতে ভয়ানকভাবে মরার চেয়ে আত্মহত্যা করে মরাই অনেক ভালো৷ "
লেখাটা দেখে চমকে উঠে গোয়েন্দা নিল।
নাস্তা শেষে সজীব বিছানার একপাশে বসে আছে তখন তার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে৷ সজীব কল রিসিভ করতেই অপরপাশ থেকে আওয়াজ আসে, " সজীব, সুমনকে আমি আমার অফিসের পাশে হাঁটতে দেখলাম আজ সকালে। কিন্তু আমি তাকে ডাকলেও না দেখার ভান করে চলে গেল কেন? "
কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারে এটা বাধন। সজীব মনেমনে একপ্রকার বড়সড় ধাক্কা খায়। অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, " সুমন তো এখন ঢাকায়, তার খালার বাসায় গিয়েছে৷ তোর চট্টগ্রাম কীভাবে দেখবি! ভুল দেখিসনি তো আবার? "
বাধন একটু কঠোর গলায় বলে, " ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছিলাম, আমি নিশ্চিত এটা সুমন ছিল। তবে আমাকে দেখেও না দেখার ভান করলো! "
সজীব কিছু বুঝতে পারছে না। দিপু তাকে ভুল কিছু বললো, নাকি বাধন তাকে ভুল কিছু বলছে! মাথায় ঢুকছে না কিছু তার। সজীব কথা ঘুরিয়ে বাধনকে প্রশ্ন করে, " বিন্দু কেমন আছে? "
বাধন উত্তর দেয়, " হ্যাঁ, বেশ ভালোই আছে। "
" এলাকার দিকে আসার চেষ্টা ভুলেও করিস না৷ তোর অনেক সমস্যা হবে, আর আমরা অনেক বিপদে আছি এখন৷ "
সজীবের কথা শুনে বাধন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, " তোদের আবার এমন কী হলো? "
" বিন্দুর বড় ভাই তোদের বিয়ে করা রাতেই খুন হয়েছে। আসামী হিসেবে টার্গেট এখন তোর দিকে। "
বাধন আবারও অবাক হয়। বলে, " আমাকে সন্দেহ করছে কেন? "
সজীব জবাব দেয়, " কারণ ওইরাতে তুই বিন্দুকে নিয়ে পালিয়েছিস। সবার ধারণা তুই সা'দ ভাইকে খুন করেছিস৷ "
বাধন আর কিছু বলার সাহস পায় না৷ সজীব আর কথা না বাড়িয়ে কল কেটে দেয়৷
গোয়েন্দা নিল এবং শুভ অরুণিমাদের বাসার উঠোনের গিয়ে দাঁড়ায়৷ অরুণিমার বাবা বাহিরে আসলে নিল উনাকে প্রশ্ন করে, " সজীবকে চিনেন? "
কাদের মিয়া একবাক্যে উত্তর দেয়, " হ্যাঁ৷ "
" আপনার মেয়ের সাথে তার কি কোনো সম্পর্ক ছিল? "
কাদের মিয়া চোখ বড় করে নিলের দিকে তাকায়৷ তারপর বলে, " না জেনে কোনো কথা বলবেন না৷ "
" না জেনে বলবো কেন? সজীব তো আমাকে এটাই বলেছিল৷ "
কাদের মিয়া কিছু না বলে চুপ থাকে৷ চুপ থাকতে দেখে নিক আবারও বলে, " আমরা চাই আপনার মেয়ের খুনিরা ধরা পড়ুক৷ এতে আপনি সাহায্য করলে নিশ্চয় আসামীদের শনাক্ত করা আমাদের জন্য সহজ হবে। "
কাদের মিয়া জিজ্ঞেস করে, " বলুন, কী জানতে চান? "
" অরুণিমা খুন হওয়ার আগে আপনার কিংবা অরুণিমার মায়ের সাথে কোনো ব্যাপারে কথা হয়েছিল? "
কাদের মিয়া জবাব দেয়, " সজীবের ব্যাপারে জানতে পেরে ওইদিন অরুকে অনেক কথা বলেছিলাম আমি। অরু রাগের মাথায় বলেছিল, নিজেকে শেষ করে দিবে। "
" আচ্ছা! তারপর কী হয়েছিল কিছু বলতে পারবেন? "
নিলের প্রশ্নের উত্তরে কাদের মিয়া বলেন, " তারপর আর কী, জানি না কিছু৷ পরদিন সকালে অরুর মরদেহ পাওয়া যায় আমাদের ঘর থেকে পঞ্চাশ ফিট দক্ষিণে রাস্তার ধারে। আর আমাদের ঘরের কোণে জাম গাছটার নিচে পাওয়া যায় অরুর রুমে কাপড় টানানোর দড়িটা। "
গোয়েন্দা নিল বেশ অবাক হয়। ঘরের কোণায় থাকা জামগাছের নিচে অরুণিমার কাপড় টানানোর দড়ি, আর বাসার পঞ্চাশ ফিট দূরে নিজের ধর্ষিত দেহ! আসলে অরুণিমার সাথে কী হয়েছিল ওইরাতে? নিল ভেবে পাচ্ছে না কিছু। কাদের মিয়াকে উদ্দেশ্য করে পাশে থাকা শুভ বলে, " আচ্ছা, দড়িটা এখন কোথায়?"
কাদের মিয়া জবাব দেয়, " সেটা তো থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।"
নিল অথবা শুভ কেউ আর কোনো প্রশ্ন করে না কাদের মিয়াকে। উনার থেকে বিদায় নিয়ে সজীবের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় দুজন। পথিমধ্যে গোয়েন্দা নিল ওসি আতিককে কল দিয়ে বলে দেয়, " অরুণিমার কাপড় টানানো দড়ির বিস্তারিত একটু ভালোভাবে দেখে নিবেন তো! "
ওসি আতিক জবাব দেয়, " আচ্ছা, ঠিক আছে। "
নিল একটু হেসে তারপর কল কেটে দেয়।
বাসায় ঢুকতেই প্রথমে দেখা হয় সজীবের মায়ের সাথে৷ সজীবের সাথে দেখা করতে বলাতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সজীবের রুমে৷ গোয়েন্দা নিল রুমে ঢুকেই সজীবকে উদ্দেশ্য করে বলে, " শনিবার মাঝরাতে তুমি অরুর সাথে দেখা করেছিলে তাইনা? "
সজীব অবাক হয়ে বলে, " কী যা-তা বলছেন? আমি কখনো রাত্রিবেলায় আরুর সাথে দেখা করিনি। "
নিল এই কথায় সজীবকে আরও পেঁচিয়ে প্রশ্ন করতে যাবে তখন সহকারী শুভ নিলের কানের কাছে গিয়ে বলে, " স্যার একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন? "
নিল অল্প আওয়াজে জিজ্ঞেস করে, " কী জিনিস? "
" গতকাল সজীবের গলায় একটা তাবিজ ঝুলানো ছিল, যা আজ নেই। "
নিল ব্যাপারটা লক্ষ্য করেনি৷ তবে বুঝতে পেরে বেশ অবাক হয়। সজীবের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে, " তোমার গলার তাবিজটা কোথায়? "
সজীব এই প্রশ্ন শুনে রেগে গিয়ে বলে, " সব ব্যাপারে আপনাদের বলতে হবে নাকি? "
গোয়েন্দা নিল সজীবকে আর প্রশ্ন না করে তার মায়ের কাছে যায়। গিয়ে জানতে চায় তাবিজের ব্যাপারে৷
" সজীবের উপর ভূতের নজর পড়েছে। কয়েকদিন ধরে তার রুম অনেক গোছালো থাকে, আগে তার একদম উল্টো ছিল৷ সজীব মাঝরাতে কার সাথে যেন কথা বলে, প্রতিরাতে লক্ষ্য করি আমি। এইতো কয়েকদিন আগে ভোরবেলায় আমি অরুকে... "
থেমে যায় সজীবের মা৷ নিল উনার থেমে যাওয়া দেখে অবাক হয়। নিল বলে, " অরুকে কী? "
" না, তেমন কিছু না৷ "
নিল বুঝতে পারে, সজীবের মা কিছু লুকাতে চাচ্ছে তাদের থেকে। তাই নিল বলে, " আপনাদের কোনো সমস্যা হলে সেটার সমাধান হোক এটাই আমরা চাই৷ আপনারা দোষী না হলে কোনো সমস্যাই হবে না আপনাদের। আমি নিশ্চিত অরুর ব্যাপারে কিছু একটা লুকাতে চাচ্ছেন আপনি। বললে আমরা সবার জন্যই মঙ্গল হবে আশা করি৷"
সজীবের মা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, " অরুর আত্মা আছে আমাদের বাসায়৷ "
নিল এমন কথা শুনে হেসে দেয়। তারপর বলে, " আপনি অরুর ব্যাপারটা লুকাতে গিয়ে এমন মিথ্যে বলছেন? "
এবার সজীবের মা বলতে থাকে, " সত্যিই অরুর আত্মা আছে এই বাসায়, আমি নিজ চোখে দেখেছি। এইজন্য সজীবের গলায় একটা তাবিজ এনে দিয়েছিলাম, তবে সেটা রাখতে পারেনি সজীব। "
সজীবের মায়ের কথাগুলো কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছে এখন গোয়েন্দা নিলের। নিল সজীবের মা'কে উদ্দেশ্য করে বলে, " মিথ্যা কিছু বললে কিন্তু পরবর্তীতে আপনাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে! "
সজীবের মা জবাব দেয়, " না, আমি একদম সত্যি বলছি সব৷ "
নিল আর প্রশ্ন না করে তাদের থেকে আজকের জন্য বিদায় নিয়ে বের হয়ে পড়ে থানার উদ্দেশ্যে।
গাড়িতে উঠতেই নিলের ফোনে ওসি আতিকের কল। নিল কল রিসিভ করে বলে, " আমি থানায় আসছি, তারপর কথা বলি? "
আতিক জবাব দেয়, " না, এখনই তোমাকে একটা কথা বলতে হবে৷ "
নিল বলে, " আচ্ছা, বলুন৷ "
" অরুণিমার কাপড় টানানোর দড়িটা নাইলনের চিকন সাইজের। "
নিল ওসি আতিককে থামিয়ে দিয়ে বলে, " এসব কথা কিন্তু থানায় গেলেও বলতে পারেন৷ "
ওসি আতিক তাগাদা দিয়ে বলে, " আরে, শোনো না৷ "
নিল জবাব দেয়, " আচ্ছা বলুন। "
" সাদমানের হাতে বাঁধ দেয়া দড়ির ছাপ পাওয়া গিয়েছে। যা অরুণিমার কাপড় টানানোর দড়িটার ছাপের সাথে হুবহু মিল! "
নিল এবার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না৷ এটা কী করে সম্ভব! তাহলে কি অরুণিমা সাদমানের খুনের সাথে জড়িত? একটা মরা মানুষ আবার কীভাবে খুন করবে সাদমানকে!
( To be continue... )

Post a Comment

Previous Post Next Post