নিয়তি (দ্বিতীয় পর্ব)



#ইমাম_হোসেন
ভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই নেহালের সাথে আমার পথচলার শুরু। ওর বন্ধু সজল, যে কি না একদিন ইচ্ছা করেই "নেহাল নামে কাউকে চিনে না" বলেছিল! সেই ভাইয়াটাকেও এখন ভীষণ আপন বলে মনে হয়। মজা করেও যে কেউ মিথ্যা বলতে পারে, এটা আমার আগে জানা ছিলো না। সজল ভাই যেভাবে বলেছিল, আমি কিন্তু সেদিন ধরেই নিয়েছিলাম নেহাল নামে কেউ ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টেই নেই। ভার্সিটির ছেলে মেয়েদের পক্ষে আসলে ঐ বয়সে সব কিছু করা সম্ভব। বন্ধুদের কোন কথাটা ফান আর কোনটা সিরিয়াস, এটা বুঝে উঠতেও আমার অনেক সময় লেগেছে।
মূল গল্পে ফিরি, আমাকে খুঁজে পেয়ে নেহালও অনেকদিন পর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতিতে। অকপটে বলে যাচ্ছে আমার সাথে কাটানো ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ কয়েক ঘন্টার স্মৃতি। আর এরপর থেকে ওর অস্হির সময় পার করার গল্প। নেহাল যেন তীর্থের কাক, কখন প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হবে, আমার সাথে আবার কবে দেখা হবে। আমি অবশ্য ওর কথাগুলোই শুনে গেলাম, আর মনে মনে নিজের কথা ভেবে লজ্জার অনুভবে। ভাবলাম এরই নামই তাহলে ভালোবাসা!
এরপর ভনিতা না করে দ্রুতই নেহালের কাছে স্যারেন্ডার করলাম। সত্য বলতে কি, ব্যাটে বলে মিলে যাওয়ায় আমাদের প্রেমটাও দ্রুত জমে যায়।
অল্প কিছু দিনের মধ্যেই নেহাল-রুবা জুটি ক্যাম্পাসে খুব দ্রুত পরিচিতি পেয়ে গেলো। দু একটা ক্লাস বাদে বলতে গেলে পুরো সময়টাতেই আমি নেহালের সাথেই। বাসা থেকে ক্লাস করি বলে বিকেলের আগেই আমাকে ফির যেতে হয়। আমি চলে গেলে নেহাল মাঝরাত পযর্ন্ত বিসিএসের প্রস্তুতিতেই বুদ হয়ে থাকে। ওর অভিধানে তখন আমি আর বিসিএস, সম্ভবত এ দুটো শব্দই।
নেহালের সাথে সম্পর্কের কথাটা কিভাবে যেনো বাসায় চাউর হয়ে গেলো। আব্বা রিটায়ার্ড সরকারি পদস্হ কর্মকর্তা, রায়েরবাজারে আমাদের নিজেদের বাড়ি। পরিবারের সামাজিক অবস্হানও অনেক ভালো। আর অন্যদিকে নেহাল গ্রামের ছেলে, এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। বাবা ভেড়ামারা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আমার বাবা মায়ের কানে সব তথ্যই পৌঁছে যায়।
কোন একদিন আমার মেডিক্যাল পড়ুয়া বড় বোন আব্বা আম্মার অসন্তুষ্টির কথাটা আমাকে জানিয়ে দেয়। আমি অবশ্য ওদের এইসব কথাবার্তাকে পাত্তা দেই না। পৃথিবীর অন্য আর কোন পুরুষ যে আমাকে আকর্ষণ করবে না, সে যতো প্রতিষ্ঠিতই বা সুপুরুষ হউক। ততোদিনে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। নেহালকে ছাড়া আমার জীবনে অন্য কাউকে চিন্তা করা কল্পনার বাইরে।
আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগে আগে নেহালের উপর দিয়ে রীতিমতো ঝড় বয়ে গেলো। জান প্রাণ দিয়ে লড়ে গিয়েও ছেলেটা ওর স্বপ্নের বিসিএসের বৈতরণীটা পার হতে পারে নি। ভাইভা থেকে আউট হয়ে যাওয়ায়, ওর সে কি মন খারাপ। কান্নারত নেহালকে জড়িয়ে ধরে স্বান্তনাও দিতে হলো। তবে ছেলেটাকে আবারো লড়ে যাওয়ার সাহস দিয়ে গেলাম, আমি নিশ্চিত পরের বার ও সফল হবেই হবে।
এদিকে ঐ সময়টাতে আমার বাসা থেকে বিয়ের জন্য ক্রমাগত চাপ আসছে। অসংখ্য রেডিমেড বিসিএস, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার পাত্রদের প্রস্তাবের ঢল, আমি বায়োডাটার চাপে রীতিমতো নিষ্পেষিত। অনেক কষ্টে প্রস্তাবগুলো আটকাতে লাগলাম। অবশ্য আমার ডাক্তার বোনটাও আমাকে এতে সাহায্য করলো। আপু সত্যই আমাকে বোঝে। আর ও মনেপ্রাণেই চায়, আমি যেনো ভালোবাসার মানুষটার সাথেই সংসার করি।
এভাবে আমার আর নেহালের আরো কিছু কঠিন সময় কেটে গেলো।
আমার মাস্টার্সের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রায় একই সময় দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত রকমের সংবাদ পেলাম। আর তাতে আমার জীবনটাও ভীষণভাবে পরিবর্তিত।
কলাভবনে একদিন মনোযোগ দিয়ে শফিক স্যারের ক্লাস করছি। এমন সময় সিনেমার নায়কদের মতো পত্রিকা হাতে নেহাল দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললো "রুবা, আমি বিসিএস কর ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত । এই দেখো পত্রিকায় আমার রোল নাম্বার। বলো কবে তোমাদের বাসায় যাবো?" আমি নেহালের কাংখিত এই সাফল্যে সম্ভবত ওর চাইতেও বেশি খুশি।
ছেলেটা সত্যই অদম্য, গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে আসা। নিজের সামাজিক অবস্হান পরিবর্তনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিসিএসের স্বপ্নটা সম্ভবত ওর সেখান থেকেই জোরালো। নেহালের ধারণা আমার বাবা নিশ্চয়ই বিসিএস প্রেমিক পাত্রকে ফেলে দিবে না। আমার অবশ্য ওর এসব ভাবনা মাথাতেই আসে না। নেহালের সাফল্যই যে আমার নিজেরই, বিসিএস না হলেও নেহাল যে আমারই। সবমিলিয়ে ওর খুশিতেই আমি ভীষণ খুশি। নেহাল এখন একই সাথে সংসার আর চাকুরী শুরু করার স্বপ্নে বিভোর, আমিও ওর ভাবনার সাথেই।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে এর কিছুদিন পরই আমি ক্রমাগত শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে শুরু করি। ডাক্তারের পরামর্শে জটিল কিছু ডায়াগনস্টিক টেস্টও করতে হলো। শরীর এতোটাই খারাপ যে সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়, পরিবারের অন্যদের মতো নেহালও সারাক্ষণই আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায়। কিছুক্ষণ পরপর ফোনে স্বান্তনা দিয়ে যায়।
আমার পরিবারের সদস্যরা রিপোর্টের ফলাফল জানলেও আমাকে কিন্তু অন্ধকারেই রেখে গেলো। তবে আচমকাই পুরো পরিবারের সদস্যদের মন খারাপ, বিশেষ করে মায়ের ক্রমাগত কান্নাটায় বুঝলাম খারাপ কিছু হয়ে গেছে।
সবাইকে প্রশ্ন করি "আমার কি হয়েছে?" কেউই উত্তর দেয় না, শুধুই কাঁদে। আমার বাবা খুব শক্ত মনের একজন, যাকে আমরা কখনো চোখের পানি ফেলতে দেখিনি। সেই বাবাও আমার কাছে আসলে এখন কারণে অকারণে কেঁদে ফেলেন। সব মিলিয়ে পুরো পরিস্থিতিটা আমার জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর, সব দেখে আমি নিশ্চিত খুব শীঘ্রই মারা যাচ্ছি।
তাইতো বাধ্য হয়েই কাতর চোখে একদিন বোনকে জিজ্ঞেস করলাম। "আপু সত্য করে বলোতো আমার কি হয়েছে?"
আমার ডাক্তার বোনটা হয়তো বাধ্য হয়েই বলে "রুবা, তোর ক্যান্সারটা খুব আর্লি স্টেজে। রিকভারেবল। আমরা চিকিৎসা করাচ্ছি। একটুও চিন্তা করিস না বোন, সব কিছু আবার আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।" কথাগুলো বলে আপু আর শক্ত থাকতে পারলো না। অঝোরে কাঁদতে লাগলো। আর আমার চোখে তখন সদ্য বিসিএস সুপারিশপ্রাপ্ত নেহালের মুখটা ভেসে উঠলো। ছেলেটা যে এখন আমাকে নিয়ে সংসার করার স্বপ্নে বিভোর, আর আমি নিজেও যে নিজেকে রোজ রাতে বধু সাজে দেখতে দেখতে ঘুমোতে যাই!
আমাদের পরিবারটা আদতেই একটা সুখী পরিবারের বিজ্ঞাপন। আমাদের দু বোনকে নিয়ে বাবা মায়ের আনন্দের শেষ নেই। আমার বড় বোন পিঠাপিঠি, একটা বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করে সদ্য ইন্টার্নি শুরু করেছে। বাবা ডায়াবেটিস ও হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী বলে, সংসারের বড় একটা দ্বায়িত্ব এখন মায়ের কাধে। ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসায় আমাকে নিয়ে ছুটোছুটি করার মতো কেউ এ বাসায় নেই। ঠিক এমন একটা কঠিন সময়ে নেহাল এসে আমাদের পরিবারের পাশে দাড়ালো। বাবা মাও যেনো একজন দ্বায়িত্ববান লোক পাশে পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে।
এরপর থেকে আমাকে ডাক্তার হসপিটাল বাসা এর সব কিছুতেই বাবা মা বা আমার বোনের সাথে নেহালের উপস্থিতি আমাকে বাড়তি সাহস দেয়, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। প্রথম কেমো থেরাপিটার পর যখন আমি একটু ভালো ফিল করছি, নেহাল একদিন আমার হাত ধরে বললো "রুবা আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, দ্রুতই।"
নেহাল আমার জীবনের একমাত্র ও শেষ পুরুষ এটা আমার খুব ভালো করেই জানা। ভালোবাসার এই মানুষটা আমার বিপদে সর্বক্ষণ পাশে আছে, সেরে উঠার আশা দেখাচ্ছে, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এই ছেলেটাই যখন ক্যান্সার আক্রান্ত এই আমাকে বিয়ে করার কথাটা জানায়, একটু হোচট খাই। অসুস্থ এই আমার কি নেহালকে বিয়ে করা ঠিক হবে! আমি একটু উদাস হয়ে ভাবি, চোরা চোখে নেহালকে দেখি। অবলীলায় আমার হাত ধরে আছে, কি পবিত্র এই স্পর্শ।
নেহালের ক্রমাগত ভালোবাসার চাপে শেষ পযর্ন্ত বিয়ের সিদ্ধান্তে সায় দিলাম। আমার পুরো পরিবার নেহালের প্রতি এরই মধ্যে কৃতজ্ঞতায়, আর তার উপর ওর বিয়ের প্রস্তাবটায় ভীষণ অবাক। বাবা নেহালকে সবকিছু সময় নিয়ে ভেবে জানানোর অনুরোধ করলো।
নেহাল কিন্তু সময় নেই নি, সে আমাকে বিয়ে করে সংসার করত চায়। আর ওর এই সিদ্ধান্তেই অটল। এরপর ভেড়ামারা থেকে ওর বাবা মা ও কিছু আত্মীয় স্বজনরাও আমাদের বাসায় এলো। সবাই সব কিছু জেনেই বিয়ের পাকা কথায় সায় দিয়ে গেলো। আমি কিন্তু শারীরিক কষ্টের মধ্যেও বিয়ের কনে সাজে নিজেকে কল্পনা করে ভীষণ সুখ পাই। নেহাল আমাকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়, সংসার সন্তান এসব ভাবনাতেই যেন আমি অর্ধেক সুস্হ।
নেহালের সাথে আমার বিয়েটা জাকজমকভাবেই হলো। আমাদের শুভাকাংখী আর স্বজনদের ভালোবাসা চোখে পড়ার মতো। বধু সাজে আমাকে দেখে নেহালও অবাক। আমাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে ফিসফিসিয়ে বললো "রুবা, চোখ ফেরাতে পারছি না।" নেহালকে সুখী দেখতেই আমার তৃপ্তি। আমিও ফিসফিসিয়ে বললাম " জামাই সাহেব, তোমার প্রতিও আমার অনেক কৃতজ্ঞতা। " স্মিত হেসেই।
চলবে,,,,,

Post a Comment

Previous Post Next Post