নিয়তি (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)



#ইমাম_হোসেন
জমকালো আমার বিয়ের অনুষ্ঠানটার সপ্তাহ খানেক যেতে না যেতেই শরীর আবারো খারাপ করলো। খুব শখ ছিলো নেহালকে নিয়ে কক্সবাজারে হানিমুনে যাবো। মনে হলো বিধাতা আমার সব শখ পূরণ করার সুযোগ দিবে না। এ দফায় বিছানায় পড়ে যাওয়াটায়, ক্যান্সারের চাইতে এর চিকিৎসার প্বার্শপ্রতিক্রিয়াটাই কাবু করে দিলো।
আশ্চর্য হলেও সত্য, বিয়ের পর নেহাল আমার প্রতি যতোটা না দ্বায়িত্ব বাড়িয়ে দিলো, আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা ততোটাই ব্যাকফুটে। হয়তো এরই মধ্যে সবাই ভীষণ টায়ার্ড। আমার কিন্তু এতে একটুও মন খারাপ নয়, স্বামী সর্বক্ষণ পাশে আছে বলেই।
আমার আর নেহালের ছোট্ট একটা বাসা থাকবে, সেই বাসাটা মনের মতো করে সাজাবো। অফিস শেষে এক সাথে চা আড্ডা হবে। ভালোবাসার লুটোপুটি চলবে। ঘর আলো করে এক সময় সন্তান আসবে। বাচ্চার কান্নায় ভাসা সুখের এই সংসারের স্বপ্নটা প্রায় প্রতিদিনই দেখি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে। তবে এটাও জানি স্বপ্নটা অধরাই।
মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার মতো শারীরিক অবস্হা আর নেই, ভীষণ মন খারাপ। নেহাল স্বান্তনা দেয়, বিভাগের শিক্ষকদেরকেও হাসপাতালে নিয়ে আসে। স্যাররা অভয় দেয়, একটু সুস্থ বোধ করলে সিক বেড পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্হা করবে বলে জানাতে খুব খুশি হলাম। সত্য বলতে কি, গুরুতর অসুস্থদের জন্য এই পৃথিবী অনেক মায়াময়।
ঐ সময়টাতেই নেহালের সরকারি চাকুরীতে যোগদান। এতে আমার দেখভালে কিছুটা সমস্যা তৈরী হলো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কেমোথেরাপির পরবর্তী সময়ের জন্য ভেড়ামারা থেকে নেহাল ওর মা কে নিয়ে আসে। সলিমুল্লাহ রোডে দু কামরার একটা ছোট্ট বাসায় শ্বাশুড়িকে নিয়ে নিজের সংসার যাত্রা শুরু করে দিলাম।
বাবার বাসায় থাকা কাজের সাহায্য কারী মেয়েটা আমাকে খুব মায়া করে, ও কিছুতেই একা ছাড়বে না। অনেক মায়া নিয়ে সেই আয়েশাও চলে এলো, নতুন নেওয়া বাসাটায়। বাবুই পাখির এই বাসাটায় নিজেকে অনেক সুখী আর সুস্হ বলে মনে হলো। অসুস্থতার মধ্যেও মনোযোগ কিন্তু এই বাসাটা সাজাতেই, স্বপ্নের মতো করে।
আশার কথা যে তৃতীয় কেমোথেরাপিটার পর শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে। খাওয়া দাওয়ায় রুচি ফিরে পাই, চলাফেরাতেও আগের মতো খুব একটা সমস্যা নেই। এমনকি ঘরের বাইরেও যেতে পারি। শ্বাশুড়িকে নিয়ে প্রায়ই বাবার বাসায় চলে আসি। আর আমার বাবা মা তো সুযোগ পেলেই এ বাসায় ঢু মারে। নেহালও নতুন চাকুরী, ট্রেনিং এগুলো নিয়ে অনেক ব্যস্ততায়। সব কিছু মিলিয়ে এ সময়টাতে বাসাটা যেনো প্রাণ ফিরে এলো। বাইরে থেকে দেখলে এখন কেউ বুঝবে না এখানে একজন ক্যান্সার রোগীর বসবাস।
অনকোলজিস্টের পরবর্তী এপয়ন্টমেন্টে নেহাল ডাক্তারকে " এ অবস্থায় বাচ্চা নেওয়া সম্ভব কি না?" প্রশ্নটা করতেই রীতিমতো থতোমতো খেলাম। এ কথা সত্য একটা বাচ্চা আমার অনেকদিনের স্বপ্ন। তাই বলে শারীরিক এই অবস্হায়, বাচ্চা নেওয়ার বিষয়টি মাথাতে একেবারেই আসে নি। তারপরও চুপচাপ করে ডাক্তার আর নেহালের কথোপকথনটা শুনে গেলাম।
কেমোথেরাপির পর সাধারণত বছর দুয়েকের মতো অপেক্ষা করতে হলেও, আমার শারীরিক অবস্হা না কি এখন অনেকটাই ভালো। এই বিবেচনা করে বছর খানেক পর বাচ্চা ট্রাই করা যেতে পারে বলে ডাক্তারের অভিমতে নেহালকে উৎফুল্ল বলেই মনে হলো। আমার কাছে ওদের পুরো কথোপকথনটাই স্বপ্নের মতো বলে মনে হলো। আদৌ কি আমি সন্তানের মা হতে পারবো, মৃত্যুর আগে নেহালের ইচ্ছাটা কি পূরণ করে যেতে পারবো। ভুলে থাকতে চাইলেও বারবার যে মনে পড়ে যায়, আমি এক মৃত্যু পথযাত্রী, তবে পূর্ণতার স্বপ্নেও।
অনেকের মনে হতে পারে ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ কিভাবে জোগাড় হচ্ছে! আমি আমার বাবা মায়ের প্রতি প্রথম থেকেই অনেক কৃতজ্ঞ। বাবা সাধ্যাতীতভাবেই খরচ করে গেছে। পৈত্রিক ভাবে প্রাপ্ত নড়িয়ার জমিগুলো বাবা পানির দরে বিক্রি করেছেন, শুধু মাত্র চিকিৎসা খরচ মেটাতেই।
বিয়ের পর নেহাল নিজ পরিবার বা স্বজনদের কাছ থেকে ধার দেনা করলেও, আমার বাবা মায়ের সাহায্যের হাত সবসময়ই থাকলো। বাবা যখন মেয়ের জন্য দরকার হলে বাড়ি বিক্রি করতেও রাজি বলে জানায়, আমি শুধু নিরবে দোয়া আর কান্না করে যাই। সত্যই আমি অনেক ভাগ্যবান।
এদিকে নেহাল অনাগত সন্তানের আগমনের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে, ডাক্তারের সাথে নিয়মিত ফলো আপেও আছে। আমার খাবার দাবার আর যত্ন আত্তিতে আর সেই সাথে চিকিৎসার বিষয়ে সবসময়ই সচেতন। এর মধ্যে দু একবার শরীর খারাপ হলেও, সব মিলিয়ে বেশ ভালোভাবেই সময় কেটে যায়। দু পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতাটা ছিলো অসীম। প্রায় বছর খানেক পর একদিন সত্যই যখন মা হতে যাচ্ছি, এই সংবাদটা পাই। নিজের কাছেই কথাটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হলো।
আর এরপর থেকেই শুরু হলো জীবনের আরেক যুদ্ধ। অনাগত এই বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনার এক গুরু দ্বায়িত্বে আমার সাথে অন্য সবাইও ঝাপিয়ে পড়লো। পেশেন্ট হিসেবে প্রেগন্যান্সিতে হাই রিস্কে তার উপর বাচ্চার উপর প্বার্শপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবের আশংকাটাও ছিলো। সব মিলিয়ে প্রতিটা দিন উৎকন্ঠা আর উত্তেজনার মধ্য দিয়েই কাটাতে লাগলাম।
প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাসের কথা মনে হলে এখনো চমকে উঠি। বলতে গেলে চব্বিশ ঘন্টাই বিছানায় ছিলাম। স্ত্রীর অসুস্হতার বিবেচনায়, নেহালের ঢাকায় পোস্টিং হলো। যতোটুকু সময় অফিস না করলেই নয়, বাকি সময়টা ও আমাকেই সময় দেয়। দেশের সেরা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসা চললো প্রেগন্যান্সির পুরোটা সময়।
সত্য বলতে কি শারীরিক ভাবে আমি যতোটাই অসুস্থ থাকি কি না, মানসিকভাবে বরাবরই শক্ত ছিলাম। স্বামীর পাশাপাশি স্বজনদের আকুন্ঠ ভালোবাসা ও সেবা পেয়ে। আমার প্রেগন্যান্সিটা সবার জন্যই যেনো একটা চ্যালেঞ্জ। সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমতে, এক শুভদিনে কন্যা সন্তানের মা ও হলাম। তার চাইতেও বেশি খুশি হলাম নেহালকে পিতৃত্বের স্বাদটা দিতে পারলাম বলেই। নেহাল খুব শখ করে মেয়ের নাম রাখলো "আলিয়া"।
আমার প্রসবকালীন সময়টাতে ভয়ানক রকম জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ভেবেছিলাম এ যাত্রায় হয়তো আর বাঁচবোই না। আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম সন্তান জন্ম পযর্ন্ত যেনো আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। নেহালকে পিতৃত্বের স্বাদ দেওয়াতেই যেনো আমার পূর্ণতা, এই ভাবনাটাই তখন মাথায় ঘুরপাক খায়।
জন্মের পরপরই নার্স আলিয়াকে আমার কাছে নিয়ে আসে। তীব্র কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে আলিয়াকে দেখে অবাক, এ যেনো হুবহু নেহাল। বাবার আদলেই মেয়ের এই পৃথিবীতে আসা। পুতুলটাকে ছুঁয়ে দেখি আর অবাক হই। এ আমার গর্ভজাত, ওর বাবা নেহাল। ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে, অজান্তেই খুব বাঁচতে ইচ্ছা করে। কি যে এক মায়ার এই পৃথিবী! ছেড়ে যেতে মন চায় না।
আমি খুব ভালো করেই জানি, বেশিদিন আর বাঁচবো না। প্রায়ই লুকিয়ে গুগল সার্চ করি। আমার মতো কন্ডিশনের পেশেন্টদের লাইফ এক্সপেকটেন্স ডায়াগনোসিসের পর সর্বোচ্চ পাঁচ কি ছয় বছর হয়ে থাকে। হিসাব কষি। আলিয়ার জন্ম হলো আমার ক্যান্সার ধরা পড়ার তিন বছরেরও বেশি দিন পর। তাইতো মনে মনে আসন্ন মৃত্যুর শংকাটা আসে কিন্তু তারপরও মনকে শক্ত রাখি। প্রতিটা দিনকেই উপভোগ করার চেষ্টা করি, শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েই।
প্রেগন্যান্সি পরবর্তী সময়ে আমার লম্বা একটা সময় হাসপাতালে থাকতে হলো। এ সময় "আলিয়ারও" সর্বোচ্চ দেখভাল চললো। মা ও মেয়ের সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার পরই আমাদের বাসায় আসা। স্বপ্নে দেখার মতোই আলিয়ার কান্নায় বাসা এখন সরগরম। আর সেই সাথে সদ্য পিতৃত্বের স্বাদ পাওয়া নেহালেরও বাচ্চাকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততা। বিছানায় শুয়ে এসব দেখতে খুবই ভালো লাগে। সত্যই আমার আর চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই, পূর্ণতার এই ভালোবাসার সংসারটাকে পেয়ে।
বেড রুমের কোনায় নেহাল একটা দোলনা বসিয়েছে। বাচ্চাকে পরম মমতায় এখন দোল দিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু নেহালের দিকে এক মনে তাকিয়ে আছি। আর ভাবছি এ ছেলেটা আসলেই অন্য গ্রহের এক মানুষ, ও ছিলো বলে আমার এখনো বেঁচে থাকতে পারাটা। একটা মানুষ প্রেমিকার জন্য কতোটা স্যাক্রিফাইস করতে পারে তার উদাহরণ এই নেহাল। ভীষণ কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজে আসে।
ইদানিং প্রায়ই এলোমেলো ভাবনা চলে আসে। আমি মারা গেলে হয়তো নেহাল আবারো অন্য কাউকে বিয়ে করবে। হয়তো নিজে থেকেই হোক কিংবা সমাজ পরিবারের চাপে। কিন্তু এই বিষয়টি ভেবে আমি একটুও বিচলিত হই না। আমার সাথে দেখা হওয়ার প্রথমদিন থেকে এখনো পযর্ন্ত নেহালের পৃথিবীটা শুধুই আমি ময়, এটা আমার খুব ভালো করে জানা। আর এতো ঝড় ঝক্কি আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে জন্ম নেওয়া আমাদের "আলিয়া" যেনো আমাদের দুজনের ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতেই। এটাও আমার জানা আলিয়ায় বাবা ওর মেয়েকে সারাজীবনই আগলে রাখবে। তাইতো সবমিলিয়ে আমি এখন ভীষণ সুখী ও তৃপ্ত, জীবনে খুব বেশি কিছু যে আমার আর চাওয়ার নেই।
(শেষ।)

Post a Comment

Previous Post Next Post