নেহালের সাথে আমার বিয়ে হলো ঠিক প্রথম কেমোথেরাপিটা দেওয়ার পরপরই। কেমোর কারনে মাথায় তখন একটা চুলও অবশিষ্ট নেই। আমিই মনে হয় বাংলাদেশের প্রথম কোন বিয়ের কনে, যে কিনা চুল বিহীন কনে সাজে বিয়ের পিড়িতে।
তবে বিশ্বাস করুন, শহরের সেরা ব্রাইডাল আর্টিস্ট তার পুরো মেধা দিয়েই আমাকে সেদিন সাজিয়েছে। নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলাম। পার্লারে আমার মা বোনও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। যদিও জানি ওদের এই কান্নাটায় পৃথিবী থেকে আমার দ্রুত চলে যাওয়ার শংকাটাও আছে আর আনন্দ অপরিসীম।
এরপর মহা ধুমধাম করে রাজধানীর একটা নামী কনভেনশন হলে শ তিনেক আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতিতে নেহাল আর আমার বিয়ের অনুষ্ঠান। সবার জন্যই হয়ে রইলো অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত একটি মেয়ের বিয়েতে আসা সবাই উৎফুল্ল, যদিও মানুষের সহানুভূতির চোখ আমাকেও সিক্ত করে। প্রাণভরে সবাই দোয়া দিলো। সত্য বলতে কি মৃত্যু পথযাত্রীর কোন শত্রু নেই, হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সবাই আপন করে নিতে চায়।
আজকের এই গল্পের নায়কের নাম নেহাল। যে কি না নাটক সিনেমার নায়কদের চেয়েও অনেক সাহসী আর ভীষণ জেনুইন এক প্রেমিক। কোথা থেকে যে নেহালের প্রসঙ্গটা শুরু করবো বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে আমাদের দুজনের প্রথম দেখা আর পরিচয়ের মুহূর্তটা দিয়েই তাহলে শুরু করছি।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হওয়ার সুযোগে আমার মতো পুরো পরিবারও ভীষণ খুশি। লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে পাশ করা আমি রুবা একেবারেই গড়পড়তার এক ছাত্রী। এইচএসসির পর কোচিং আর মেডিক্যাল পড়ুয়া বড়বোনের উৎসাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় টিকেও গেলাম। চোখে অনেক স্বপ্ন, বড় কিছু হওয়ার।
জীবনের প্রথম একা একা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে আসলাম। উদ্দেশ্য ভর্তি ফরম ফিলাপ করবো, এমন সময় মনে পড়লো সাথে কলম নেই। আশেপাশে দু একজনকে কলম আছে কি না জিজ্ঞেস করে বিফলও হলাম। অতীব প্রয়োজনীয় একটা জিনিস সাথে আনিনি বলে নিজেকেই মুন্ডুপাত করতে লাগলাম।
ঠিক এমন সময় একটু দূরে এক সুদর্শন যুবককে মনোযোগ দিয়ে কাগজে কিছু একটা লিখতে দেখতে লাগলাম। অল্প বয়স তার উপর জীবনের প্রথম বারের মতো একা একা এই সুন্দর পৃথিবীটাকে এক্সপ্লোর করছি। সুন্দর যুবক দর্শনেও আমার মধ্যে অন্য রকম শিহরণ। রথ দেখা আর কলা বেচার মতো তাইতো সাহস নিয়ে যুবককে জিজ্ঞেস করে ফেললাম "এক্সকিউজ মি, আপনার কাছে কি এক্সটা কোন কলম হবে? ফরমটা ফিলাপ করে ফেরত দিয়ে দিবো।" জীবনের প্রথম কোন অচেনা যুবকের সাথে এভাবে কথা বলতে গিয়ে আমার বুক ধরফরানিটা টের পাচ্ছিলাম।
হুম, নেহাল আর আমার প্রেম ভালোবাসার গল্পের প্রথম সিকোয়েন্স কিন্তু এটাই। নেহাল আচমকাই আমার করা প্রশ্নে খানিকটা ভিমড়ি খেয়ে, নিজের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই আমাকে কলমটা দিয়ে বললো " আমার কাছে একটাই কলম। এটা আপনি নিন, আমার কাজটা অতোটা জরুরী নয়!"
আমি অবাক হয়ে ছেলেটাকে দেখতে লাগলাম, সৌজন্যতার সাথে নেহালের চরিত্রে থাকা কেয়ারিংনেসটাও সেদিন থেকেই আমার কাছে স্পষ্ট। এই ছেলে যে মেয়েদের সন্মান করতে জানে, এটা বুঝতে সময় নিলো না।
এরপর আমি ফরম ফিলাপ করছি, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী নেহাল আমাকে সাহায্য করে যাচ্ছে। খুব যত্ন করে ফিলাপ করা ফর্মটাও নিজে থেকে গিয়ে লাইনে দাড়িয়ে জমা দিলো।
এরপর আমার সাথে হেটে হেটে টিএসসিতে এসে আমার ব্যাংকের কিছু ফর্মালিটিজ ছিলো, সেগুলোও শেষ করলো। এরই মধ্য জেনে গেলাম, নেহাল কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার ছেলে, সূর্য সেন হলের আবাসিক ছাত্র। আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই ঘন্টা তিনেক সময়ের মধ্যেই নেহালকে আমার ভীষণ আপন বলে মনে হলো। আমাকে রায়েরবাজারের রিকশা ধরিয়ে ছেলেটা যখন হাসিমুখে বিদায় নিলো, বুঝলাম আজ আমার মধ্যে কিছু হয়ে গেছে!
সেদিন বাসায় ফিরতেই পরিবারের সবাই অবাক, প্রথমদিন ভার্সিটিতে একা একা গিয়ে একেবারে ভর্তি হয়ে এসেছি বলে। নিজেকে বড় হয়ে গেছি বলে মনে হলো, ভার্সিটি স্টুডেন্ট। এই একদিনেই যেন অনেক পরিনত। তো এই নব্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর হৃদয় এখন উথাল পাতাল, নেহাল নামের একটি ছেলের জন্য এই তথ্যটা অবশ্য পরিবারের কেউ জানে নি।
তবে এ কথা সত্য যে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় কাটানো এই মানুষটির জন্য ভীষণ অচেনা একটা অনুভব, কেমন যেনো কষ্ট কষ্ট সুখ সুখ। ঠিক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সেই ছেলেটার ফোন নাম্বার বা ঠিকানা, কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি বলে আফসোসের সীমা রইলো না।
ক্লাস শুরু হতে তখনো দু মাস, এই কয়দিন কিভাবে ছেলেটার সাথে দেখা করার অপেক্ষায় থাকবো? ভীষণ অস্হিরতায় ভুগতে লাগলাম। আর পারলাম না। দু সপ্তাহ পর শামসুন্নাহার হল, আমার এটাচড হল। ওখানে কিছু কাজ আছে এই বাহানায় বাসা থেকে বের হয়ে সোজা চলে এলাম কলাভবনে।
ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টের সামনে ঘুরাঘুরি করলাম, নেহালের দেখা পাবো বলে। সাহস করে একজনকে জিজ্ঞেসও করলাম, তৃতীয় বর্ষের নেহালকে চিনে কি না? ছেলেটা অবলীলায় বলে ফেললো "এই নামে তৃতীয় বর্ষে কোন স্টুডেন্ট আছে বলে আমার জানা নেই? আমিও তো থার্ড ইয়ারেরই।"
এইবার সত্যই খুব কষ্ট পেলাম। তাহলে কি ঐ দিন ছেলেটা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে? না কি আমি ভুল শুনেছি? তারপরও একবার ভাবলাম, সূর্যসেন হলে যাই, ওখানে গিয়ে নেহালে খোঁজ নেই। কিন্তু তারপরও কি ভেবে যেন আর যাওয়া হলো না, মন খারাপ করে বাসায় ফিরলাম। সেই তখন থেকে ব্যাগ থেকে নেহালের দেওয়া সেই কলমটা বের করে দেখে যাচ্ছি। একটা কলম একই সাথে কতোটা ভালোবাসার আর কতোটা কষ্টের হতে পারে!
নেহালের সাথে দেখা হওয়ার সম্ভবনা নেই, কথাটা ধরে নিয়েই আমি এর কয়েক সপ্তাহ পর ভার্সিটির প্রথম ক্লাসে গেলাম। ইতিহাস বিভাগের জাঁদরেল শিক্ষকদের দেওয়া স্বাগত ভাষণে বুঝলাম, এখানে ভালো রকমের শিক্ষাই পাবো। আমার স্কুল বা কলেজের পরিচিত কেউই ইতিহাস ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়নি। আমার কলেজের প্রিয় বান্ধবী তুলি, ও পলিটিকাল সাইন্সে ভর্তি হয়েছে। তাইতো ওর সাথে দেখা করে একসঙ্গে আমরা মধুর কেন্টিনের দিকে যাচ্ছি। ঠিক এমন সময় অনেক দূর থেকে হাজারো মাইল বেগে এক ছেলে দৌড়ে এসে আমাদের দুজনের সামনে এসে আচমকাই দাড়ালো।
আমি হঠাৎই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, তুলি সম্ভবত একটা ছেলের করা এরকম এপ্রোচে ভয় পেয়ে গেলো। তবে আমি যে এক মুহূর্তেই চিনে ফেললাম। এ যে আমার হারিয়ে যাওয়া খুব আপন একজন মানুষ, নেহাল।
ছেলেটা হাপাতে হাপাতো এক রাশ বিস্ময় নিয়ে বললো "রুবা, অবশেষে তোমার দেখা পেলাম?" আমি পুরো ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব, আশেপাশে ততোক্ষণে ছোটখাটো একটা জটলাও জমে গেছে। অনেকগুলো কৌতূহলী চোখ। লজ্জায় আমি বান্ধবী তুলিকে ধরে থাকলাম। উত্তেজনায় আমি নিজেও কাঁপছি। তুলি ফিসফিসিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো "ছেলেটাকে কি চিনিস?" আমি মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলাম, হয়তো মুখে ভালো লাগার অভিব্যক্তি নিয়েই! এরপরই তুলির দেওয়া ভুবন মোহনী হাসি আর নাটক সিনেমার মতো করেই বলা "তোরা থাক, আমি একটু লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছি।"
চলবে,,,,
